খাদ্য ও ব্যায়ামে কোলেস্টেরল কমান

বিশেষ প্রতিবেদক :

কোলেস্টেরল রক্তচাপ বাড়িয়ে দেয়, ওজনকে নিয়ে যেতে পারে অস্বাস্থ্যকর মাত্রায়। কমিয়ে দিতে পারে শরীরের স্বাভাবিক রক্ত সঞ্চালনের গতি। এছাড়াও বুক ব্যথা, পেট ব্যথা, ‘গলব্লাডার’য়ে পাথর সৃষ্টি এবং হৃদরোগের মতো জটিল সমস্যার কারণও এই কোলেস্টেরলের উচ্চমাত্রা।

চিকিৎসাবিজ্ঞানের তথ্যানুসারে, কোলেস্টেরলই খারাপ নয়, ‘হাই-ডেনসিটি লিপোপ্রোটিন (এইচডিএল)’ নামক কোলেস্টেরল শরীরে তৈরি করে স্বাস্থ্যকর ও প্রয়োজনীয় চর্বি এবং সাহায্য করে ওজন কমাতে।

‘লো-ডেনসিটি লিপোপ্রোটিন (এলডিএল)’ হল ক্ষতিকর কোলেস্টেরল, যা ধমনীতে চর্বি জমায় এবং রক্ত সঞ্চালন ব্যহত করে। তাই এই কোলেস্টেরল শরীর থেকে বের করা যে জরুরি তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

কোলেস্টেরল মানুষের শরীরে জৈবিকভাবেই তৈরি হয় যকৃতের মাধ্যমে। তবে খাদ্যাভ্যাসের পছন্দের উপর ভিত্তি করে শরীরে এর মাত্রা বাড়ে, আর তখনই স্বাস্থ্যকর কোলেস্টেরলের চাইতে ক্ষতিকর কোলেস্টেরলের পরিমাণ বেড়ে যায়। তাই সব বয়সের মানুষের উচিত কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখা।

দৈনন্দিন অভ্যাসে কিছু পরিবর্তন আনার মাধ্যমেই তা সম্ভব। এরই সহজ কিছু অভ্যাস সম্পর্কে জানানো হলো স্বাস্থ্য-বিষয়ক একটি ওয়েবসাইটে প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্যের আলোকে।

কেনার আগে পণ্যের বিবরণ দেখা: যেকোনো ভোজ্য উপকরণ কেনা ও পেটে চালান করার আগে জানা উচিত তাতে কী উপকারী ও অপকারী উপকরণ আছে। প্যাকেট, বোতল, কৌটাজাত পণ্য কেনার আগে এই কাজটি করা অত্যন্ত জরুরি। এমনও হতে পারে প্রচণ্ড স্বাস্থ্য সচেতন থাকার পরও প্রতিদিনের ব্যবহার্য কোনো উপাদানের মধ্যেই লুকিয়ে আছে এমন একটি উপকরণ যার কারণে সকল সচেতনতাই পণ্ডশ্রম হচ্ছে।

উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে ‘ট্রান্স-ফ্যাট’য়ের কথা। সকল ভোজ্য উপকরণের চাইতে এতেই থাকে বেশি পরিমাণ ‘এলডিএল’।

আরেকটি উপাদান হল ‘হাইড্রোজেনেটেড অয়েল, যা চিপস, প্রক্রিয়াজাত খাবার, বিস্কুট ইত্যাদি তৈরিতে ব্যবহার হয়। এই তেল হৃদযন্ত্রের বিভিন্ন সমস্যার নেপথ্যের কারণ।

পর্যাপ্ত পানি পান : শরীরের আর্দ্রতা বজায় রাখার গুরুত্ব ও উপকারী। যুক্তরাষ্ট্রের লোমা লিনডা ইউনিভার্সিটির এক গবেষণা বলে, পানি পানে পরিমাণ বাড়ানো বা দিনে পাঁচ গ্লাস পানি করা এবং নিয়মিত ‘ডিটক্স’ নেওয়া শরীর থেকে অন্যান্য বিষাক্ত উপাদানের পাশাপাশি ক্ষতিকর কোলেস্টেরল বের করে দেয়, যা পক্ষান্তরে হৃদরোগের ঝুঁকি কমিয়ে দেয় ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ। ওজন কমানো কিংবা ধূমপান ত্যাগ করার কারণেও হৃদরোগের ঝুঁকি কমে যায় একই পরিমাণ।

বাদাম : ওজন কমাতে স্ন্যাকস হিসেবে বাদাম একটি আদর্শ উপা। শুধু তাই নয়, ‘এলডিএল’য়ের মাত্রা কমাতেও বাদাম বেশ কার্যকর। চিপস, ভাজাপোড়া ইত্যাদি খেয়ে শরীরের যে ক্ষতিসাধন হয়েছে তা নিরাময় করতে পারে প্রতিদিন একমুঠ বাদাম খাওয়ার অভ্যাস কমাবে শরীরে ‘ট্রাইগ্লিসেরাইড’য়ের মাত্রাও। বীজজাতীয় খাবার থেকেও মিলবে একই গুণ

মাছ :

গবেষণা দেখা গেছে, যারা সপ্তাহে তিনদিন অথবা এর বেশি সময় মাছ খায়, তাদের শরীরে খারাপ কলেস্টেরল কম থাকে। যারা উচ্চ রক্তচাপ এবং বিভিন্ন হৃদরোগে ভুগছেন তাদের জন্য মাছ খুব উপকারী। এর মধ্যে হাই ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড রয়েছে।

এন্টি অক্সিডেন্ট-সম্বৃদ্ধ ফল ও সবজি :

সব ধরনের সবজি ও ফল আপনার কোলেস্টেরলের মাত্রাকে কমাতে সাহায্য করে। বিশেষত যেসব সবজিতে ভিটামিন সি ও বিটা ক্যারোটিন রয়েছে সেগুলো বেশি খেতে হবে।

ভিটামিন সি : ভিটামিন সি রয়েছে সব ধরনের সাইট্রাস ফলে। যেমন : কমলা, গ্রেপফল, লেবু ইত্যাদি। সব ধরনের বেরি জাতীয় ফল। যেমন : ক্র্যানবেরি, স্ট্রবেরি, ব্ল্যাকবেরি  ইত্যাদি। পেয়ারা ও আমের মধ্যেও ভিটামিন সি পাওয়া যায়। এ ছাড়া ক্যাবেজ বা পাতাকপি পরিবারের খাবারেও আছে ভিটামিন সি। যেমন : সবুজ বা চায়নিজ পাতাকপি, ব্রকোলি ইত্যাদি। ভিটামিন সি-এর আরেকটি ভালো উৎস হচ্ছে মরিচ।

বিটা ক্যারোটিন : গাঢ় হলুদ ফলে বিটা ক্যারোটিন রয়েছে। যেমন : আম, হলুদ পিচফল, কাঁঠাল ইত্যাদি। সবজির মধ্যে যেমন : কুমড়া, মিষ্টি আলু, কাঠবাদাম, গাজর ইত্যাদির মধ্যেও বিটা ক্যারোটিন রয়েছে। এ ছাড়া গাঢ় সবুজ সবজি যেমন : ব্রকোলি, পাতাকপি ইত্যাদি খেতে হবে শরীরে বিটা ক্যারোটিনের চাহিদা পূরণ করার জন্য।

যদি আপনি হৃদরোগে আক্রান্ত হন এবং কোলেস্টেরল বৃদ্ধি পায় তবে অবশ্যই নিয়মিত খাদ্যতালিকায় এগুলো রাখতে হবে।

রসুন এবং অন্যান্য পেঁয়াজ পরিবারের সদস্য 

সুস্বাস্থ্যের জন্য রসুন খাওয়ার  ইতিহাস বহু পুরোনো। গবেষকরা বলছেন, রসুন, পেঁয়াজ ও পেঁয়াজজাতীয় খাবার শরীরে বাজে কোলেস্টেরলের পরিমাণ কমায় এবং হৃৎপিণ্ডকে ভালো রাখে। তরকারি ও সালাদে আমরা এটি ব্যবহার করতে পারি। এগুলো বেশ  হৃৎপিণ্ডবান্ধব খাদ্য।

অপ্রক্রিয়াজাত দানাজাতীয় খাবার

সব ধরনের অপ্রক্রিয়াজাত দানাজাতীয় খাবারে ভিটামিন বি ও মিনারেলস রয়েছে। এগুলো চর্বি ও কোলেস্টেরল কমায়। এ ধরনের খাদ্য যেমন : রুটি, গম, ভুট্টা, ওটমিলস ইত্যাদি। ওটস-এর মধ্যে রয়েছে হাই সলিউবল ফাইবার যা কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে বেশ কার্যকর।

 ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড-জাতীয় খাদ্য 

আগেই বলা হয়েছে, ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড শরীরে কোলেস্টেরল কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে দুর্ভাগ্যবশত অধিকাংশ ক্ষেত্রে আমরা শরীরের চাহিদা অনুযায়ী পর্যাপ্ত পরিমাণে এই খাবার খাই না। এখন বিভিন্ন ধরনের প্রক্রিয়াজাত খাদ্যে ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড ব্যবহার করা হয়। শিমজাতীয় খাদ্য, ওয়ালনাট, জলপাই ইত্যাদির মধ্যে ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড পাওয়া যায়।

এই খাবারগুলো নিয়মিত আপনার খাদ্য তালিকায় রেখে শরীরে কোলেস্টেরলের পরিমাণকে নিয়ন্ত্রণে রাখুন।

শারীরিক পরিশ্রম: শরীর ভালো রাখতে করসতের বিকল্প নেই, আর তা শুরু করার সময় কখনই ফুরিয়ে যায় না। সব বয়সের মানুষের জন্যেই শারীরিক পরিশ্রমের উপায় আছে। শারীরিক পরিশ্রম কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখার মাধ্যমে হৃদযন্ত্র সুস্থ্য রাখবে দীর্ঘদিন।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, “সময় নিয়ে শুধুমাত্র হাঁটাহাঁটি আর ‘স্ট্রেচিং’য়ের মাধ্যমেও শরীরে নানান জটিলতা থেকে দূরে রাখা যায়।”

Leave a Reply

Your email address will not be published.